অর্ঘ্যকমল পাত্রের কবিতা


গুচ্ছ কবিতা

 অর্ঘ্যকমল পাত্র, চন্দনগরের প্রত্যন্ত গ্রামের এক তরুণ, জন্ম-সাল ২০০২। বর্তমানে কারিগরি বিদ্যায় পাঠরত। অর্ঘ্যকমলের দুটি প্রকাশিত কবিতার বই— “এখনই আত্মহত্যার সঠিক সময় নয়” (প্লাটফর্ম) এবং “যদি জানো বলো”(মাস্তুল)। 


 

কবিতা

মধ্যবিত্ত

আমাদের এই সাদা হয়ে যাওয়া শরীরে খানিকটা রঙ বেঁচে আছে। শীত এলে তাই দু-হাত দিয়ে ফাটা ঠোঁটকে আরেকটু চিরে, বের করে আনি রক্ত। রক্তের রং লাল। আপেলের রং লাল। শীত এলে আপেলে আপেলে ভরে যায় বাজার। এই উনিশ বছরে এসে জানতে পেরেছি —লাল খোসার ভিতরে সমস্ত আপেলটাই সাদা। অগত্যা, এইরকম সাদামাটা একখানা জীবনে আমি আর পয়সা দিয়ে আপেল কিনি না৷ ফাটা ঠোঁট চিরে, লাল-লাল আপেলরঙা রক্ত চেটে খাই…
 
 

সফলতা

প্রত্যেকদিন রাত্রে হাতের শিরা কেটে ফেলি। আর গলগল করে শরীরের রক্ত বেরিয়ে যেতে থাকে। ভাবি, এইবার আত্মহত্যা সফল হবে। কিন্তু পরের সকালে অবশ্যম্ভাবী ঘুম ভাঙেই। এভাবে কিছুদিন যেতে না যেতেই, আমি বুঝতে পারি— মৃত্যু আসলে এক স্বপ্নহীন ঘুম। তাই প্রত্যেক সকালে, এই পুনর্জন্ম পেয়ে, আমার মনে হয় — জন্ম এক সহজলভ্য বস্তু। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী মৃত্যু? অগত্যা প্রত্যেকদিন রাত্রে হাতের শিরা কেটে ফেলি ব্লেড দিয়ে। ভাবি, এইবার, ঠিক এইবার…


 
 

দৃষ্টি বিনিময়

শুধু, একটা বকুলপাতা
টুপ্ করে গিয়ে পড়ল পুকুরে
 
এবং সারা পুকুর ধীরে ধীরে
কেঁ
       পে
               উঠল…
  

প্রেমজ্যামিতি

স্কেল

চিরপরিচিত স্থির দূরত্ব
 
মেপে নিয়ে
প্রতিবার
ব্যর্থ রেখা টানা…
 
 

পেন্সিল

কেটে কেটে ক্রমশ ধারালো করি
ভাবি— একদিন ঠিক
করেই ফেলব আহত
 
কেটে কেটে ধারালো করি
আর
কাটতে কাটতেই...নিঃশেষ একদিন
 
 

চাঁদা

বৃত্ত পূরণ করে, তার কাছে ফিরে আসব একদিন
 
— এ-কথা ভেবে যাত্রা শুরু করি
এবং অর্ধেক পথ পেরিয়ে এসে দেখি—
 
আর রাস্তা নেই কোনো
 
 

কম্পাস 

নিজ স্বভাবে
নিখুঁত বৃত্ত হল না বলেই
 
ভরসা রাখতে হয়
চাতুর্যে
 
  

শামুক

আমার বুকের উপর দিয়ে
তুমি ক্রমশ হেঁটে যাচ্ছ…
 
চলে যাচ্ছ, নাকি ফিরে আসছ—
সেসব কিছু জানা নেই আপাতত
 
শুধু বুঝতে পারছি—
তোমার চলার পথ বরাবর
প্রতিমুহূর্তে ভিজে যাচ্ছি আমি
 
 

তৃতীয় বিশ্ব

পাহাড়ের গল্প মাঝেমধ্যেই শুরু হয়
পাহাড়ের গল্প কোনোদিনই শেষ হয় না
 
এবং যাদের কোনোদিন-ই
কোনো পাহাড় দেখা হয়নি
পাহাড়ের গল্প শুনে
তাদের ভিতরে ভিতরেও
 
একটা বিশাল পাহাড় জেগে ওঠে
 
 

ধ্রুপদী

আমার বন্ধুরা কত কথাই বলে, তোমাকে দেখলে
তোমার বন্ধুরা কত কথাই বলে, আমাকে দেখলে
 
অথচ,
আমি তোমাকে দেখলে চুপ
তুমি আমাকে দেখলে চুপ
 
আমাদের বন্ধুরা কত কথাই না বলে
আমাদের দেখলে…
 
 

এপিটাফ 

জন্মসূত্রে পাওয়া, একমাত্র শাড়ি
সিলিং থেকে ঝুলছে...
 
এবং শাড়ির নিম্নাঙ্গে, বানানো হয়েছে
গোল মতো এক আকৃতি।
হয়তো অন্ধকার। হয়তো বা ব্ল্যাকহোল...
 
এখন জন্মসূত্রে পাওয়া এ মাথাকে
সেখানে গলাতে গলাতে দেখছি
ফাঁসের এপাশে আছে শালগাছ
আর
ওপাশে জীবনানন্দ
 
 

কবি

নেহাত-ই কবিতাপ্রেমী, তাই
কবিতার মতো  সামান্য একটি
নিশ্চিত আশ্রয় চেয়ে
 
পেয়েছে খানিক দুঃখ
তবু তা করেছে জমা
নিজেরই এককামরা জুড়ে
 
লোকজন এসেছ, বসেছে, আর
তাকিয়ে ঘরের চারিপাশে—
ভেবেছে  স্থাপত্য সব
রোমান্টিক, চটা ওঠা রঙ…
 
নেহাত-ই কবিতাপ্রেমী,
তাই যাকে শিল্প  ভাবে
আদতে তা ক্ষতের অহং
 
 

কবি

শেষমেশ মুছে যাবে
 
—এ কথাটি জেনেও
 
            প্রতি লক্ষ্মীবারে
                ব্যর্থ আলপনা দেওয়া…

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ