সুপর্ণা মণ্ডলের কবিতা
সুপর্ণা মণ্ডলের কবিতা লেখা শুরু ২০১৭ থেকে। ২০২২-এ প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ "এসব অনেক আগের লেখা" (যাপনচিত্র প্রকাশন)। কবিতার পাশাপাশি অনুবাদ অন্যতম আগ্রহের বিষয়। পড়াশোনা করেছেন বাংলা ও তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে। বর্তমানে বিশ্বভারতীর তুলনামূলক সাহিত্য কেন্দ্রে গবেষণারত।
কবিতা
জোনাকিবৃক্ষ
তুমি
বললে, ‘কত দূর আকাশের তারা!’
গাছের শরীর জোনাকিতে ভরে দিল পৃথিবী।
তুমি বললে, ‘অনেক দূর চলে যাবো।’
তোমার পায়ের তলায় সর্ষে দিল পৃথিবী।
জোনাকির
জন্মের বহুকাল আগে
মরে গেছে
অধিকাংশ তারা
তবু তুমি
বলো, ‘জোনাকির জীবন
এত ছোট কেন?’
ফসলের শোক
বৃষ্টির মধ্যে আমি কান্না দেখি
আমার
বাবা দেখে ধান
চাষ করা
ছেড়েছে সেই কবে
তবু ঝড়
বৃষ্টি রোদে
চোখের
সামনে ভেসে ওঠে
একটা
মাঠ--
বৃষ্টি
কম হলে ধান পোঁতা হবে না
বৃষ্টি
বেশি হলে ভেসে যাবে ধান
এসব হিসাবপাতি
ভুলে গেছে তাদের সন্তান
তবুও
মাঠের দিকে মাঝে মাঝে চলে যায় চোখ
বৃষ্টির মধ্যে যেই কান্না দেখি আসলে তা
ফসলের শোক।
(যুগশঙ্খে প্রকাশিত)
নৃত্য
হাওয়া
দিলে গাছের শরীরে
অপূর্ব
নৃত্য তৈরি হয়
পাতায়
পাতায় জাগে সঙ্গীত ভাব
তখন আর
পাখি না থাকলেও চলে
কিন্তু
পাখি ছোট্ট জীব সে যাবেই বা কোথায়!
এই ভেবে
ঈশ্বর ডানা দিলেন পাখিকে
কিন্তু
গাছকে বেঁধে দিলেন মাটির সাথে
কারণ
এক জায়গায় স্থির না থাকলে
অমন নৃত্য তৈরি করা যায় না।
দীর্ঘদিন মানে
দীর্ঘদিন
মানে ঠিক কতগুলো দিন?
এই যেমন
ধরো যখন এভাবে বলি যে
দীর্ঘদিন
আমাদের দেখা হয়নি
বা দীর্ঘদিন
পর আমাদের দেখা হবে
তখন ঠিক
কতগুলো দিন বোঝাই?
কতগুলো
দিন? কতগুলো দিন?
জীবন
অনেক বড় মনে হয় কারো
জীবন
অনেক ছোট মনে হয় কারো
অনেকের
এমনও আছে যে কিছুই মনে হয় না
তবু চিরকাল
বসে থাকতে পারে না কেউ
জীবন
ও মৃত্যু এসে হাতছানি দেয়
জীবন
আর মৃত্যুর মাঝে কতগুলো দিন
দুজন মানুষের কাছে তার উত্তর একরকম হয়
না কোনদিন।
দুরন্ত সব পথ
সব বাসের
নাম দুরন্ত
দূর দূর
চলে যায়
আবার
ফিরে আসে সন্ধে নাগাদ
রাতের
বেলায় কোন বাস চলে না
সব পথ তখন অন্তহীন হয়ে যায়।
শোক
হ্যাণ্ডস্
আপ বলে চমকে দিয়েছে শোক
কোন ঢাল
নেই আবডাল নেই
দশ দিগন্তের
হাহাকার
নেমে
আসছে বুকে
প্রতি
সন্ধ্যায় ঘরে ফিরতে
টলমল
করছে পা
তোমার
চোখ আমার চোখ
শিউলি
ফুল হয়ে
ঝরে পড়ছে পথে।
পাথরের পোকা
গাছটা মাটি হয়ে গেছে
আর মাটিটা
হয়ে গেছে ঘাস
পাথরটা
উলটে দাও
দেখবে
পাথরের নীচেও
পোকামাকড়ের
বাস
মাঠেঘাটে
পড়ে থাকতে দেখবে
শতচ্ছিন্ন
কত জামা
তার মধ্যে
একটা দুটো
কুড়িয়ে
নেবে পাগল
আর তাই
গায়ে দিয়ে
পড়ে
থাকবে সেও
মাঠেঘাটে
মাটি
হয়ে
গাছ হয়ে
পাথরের পোকা হয়ে হয়ে।
লোকেশন অন থাকলে
একটা
জায়গায় কতক্ষণ থাকলে
বলা যায়
সেইখানে থেকেছি?
হয়তো
বাসে যেতে যেতে দেখেছি,
হয়তো
বাস দাঁড়িয়েছিল কিছুক্ষণ,
অমন তো কত জায়গায় থামে।
ছোটবেলায়
স্টেট বাস বললে
আমরা
স্ট্রেট বাস বুঝতাম,
যা সোজা
চলে যায়
এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়।
মাঝে কোত্থাও থামে না।
কিন্তু
লোকেশন অন থাকলে
মাঝের
সেই জায়গাগুলিও
ধরে নেয় ম্যাপে।
কতক্ষণই
বা থেকেছি সেসব জায়গায়!
গাছের কথা ভাবি
আজকাল পাখিরা খুব কাছে চলে আসে
ক্রমশ
কি গাছ হয়ে উঠছি তবে?
নাকি
এই ঘর এককালে
ছিল এক
দীর্ঘদেহী গাছ
প্রজন্মের
স্মৃতি সেই
ডালে
বসা পাখি
বয়ে
আনে জানালার গ্ৰিলে
জানালায়
বসে বসে আমিও
গাছের কথা ভাবি।
মৃত্যুর ওপার
একাহাতে
জল আটকে রাখি এমন কুঁড়েঘর
ছিল না
আমাদের।
ভেসে
গেছে যাবতীয় শোক, স্মৃতি আর জ্যোৎস্নামাখা রাত।
এই চালচুলোহীন
দাওয়ায় জ্যোৎস্না এখন বিধবার থান
আর পেটের
জ্বালায় বেরিয়ে পড়ে পিরিতির রীতি।
তুমি
কবে মৃত্যুর ওপার থেকে
ডাকবে
বলে সে তো আর বসে থাকতে পারে না!
এখন
এখন গ্রামে গ্ৰামে ঢালাই রাস্তা হচ্ছে।
তোমাদের
গ্রাম আমাদের গ্ৰামে তাই বিশেষ ভেদ নেই।
এখনও
কেউ শুশনীর শাক তুলে বেড়ায় বেড়ার ধারে ধারে?
বিক্রমের
মা গলায় দড়ি দেয়।
সাঁঝের
বেলা বিক্রমদের ডোবায় যেতে ভয় পায় কেউ?
আমরা
যারা কলকে ফুলের মধু চুরি করতাম,
উচ্ছিষ্ট
করতাম দেবতার ফুল, তাদের সবার বিয়ের বয়স হয়ে গেছে।
কারও
কারও রং কালো বলে বিয়ে হচ্ছে না।
মাঠের
ভিতর দিয়ে গ্রামান্তরে যাওয়ার পথ পদচিহ্নহীন।
(মনে
পড়ে কোথায় ছিল বনবেলীর গাছ?)
এখন গ্রামে
গ্ৰামে ঢালাই রাস্তা হচ্ছে।
আর তোমাদের
গ্রাম আমাদের গ্ৰামে...।
ধৃত মীনশরীর
মেঘেরা জাঁতা ঘোরায় আকাশের উপর
জাঁতা
ঘোরানোর শব্দ শুনে
পুকুরে
ভেসে ওঠে নীল নীল মাছ
সাদা
মাছ
মৃত্যুর
খুব কাছে চলে এলে মাছেরা
গোল গোল
চক্কর খায় জলে
ভেসে
ওঠে
একটা
মাছের পক্ষে বার্ধক্যজনিত মৃত্যু কত দুর্লভ!
তবু মাছেরা
খালি উজানে যেতে চায়
ওরাও
মানুষের মতো ঈশ্বরকে খোঁজে
খুঁজতে
খুঁজতে মরে যায়
আর গোল
গোল চক্কর খায় জলে।

এসব অনেক আগের লেখা
দুই ফর্মার এই কবিতার বইটি প্রকাশ
করেছেন ‘যাপনচিত্র’। প্রকাশকের কথায় “ আমরা সেই সকল তরুণ কবিদের বেছে নিয়েছি যাদের
এখনও কোনও কবিতার বই প্রকাশ পায়নি, কিন্তু যাদের লেখালেখি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।”
প্রকাশককে অকুণ্ঠ ধন্যবাদ জানাই সুপর্ণাকে আবিষ্কার করে পাঠকের দরবারে উপস্থিত করার
জন্য। কত প্রতিভা চিরতরে লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে যায় সামান্য প্রশ্রয় ও আশ্রয়ের
অভাবে। এই সংকলনটির প্রথম প্রকাশ জানুয়ারী, ২০২২। মোট সাতাশটি নাতিদীর্ঘ কবিতা স্থান
পেয়েছে এই সংকলনে। ছিমছাম সুন্দর প্রচ্ছদ, সুপর্ণার কবিতার মতই অনুচ্চকিত, আন্তরিক।
সুন্দর ছাপা । বেশ যত্ন করেই প্রকাশ করেছেন বইটি। বইটির বিনিময় মূল্য মাত্র ৬০ টাকা।




0 মন্তব্যসমূহ