নীলাদ্রি দেবের কবিতা

 


নীলাদ্রি দেবের কবিতা

নীলাদ্রি দেবএকজন তীক্ষ্ণ, আধুনিক বাংলা কবি ও সম্পাদক, যাঁর লেখায় সময়, প্রেম, অস্তিত্বের সংকট এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন নতুন দৃষ্টিকোণে উদ্ভাসিত। ১৯৯৫ সালে কোচবিহারে জন্ম নেওয়া নীলাদ্রি বর্তমানে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত হলেও সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে কবিতা ও গদ্য লেখায় সমানভাবে দক্ষ করে তুলেছে। তাঁর কবিতা ও গদ্যে যেন এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিধ্বনি; প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি চিত্রকল্পে রয়েছে জড়িয়ে ধরা আঘাতের ছাপ, যা পাঠককে তাড়িত করে।
নীলাদ্রির সম্পাদিত গ্রন্থ "পূর্ণেন্দু শেখর গুহ : একটি অধ্যায়", যা সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবস্থানকে সুদৃঢ় করে। তিনি সম্পাদনা করেছেন "ইন্দ্রায়ুধ" এবং "বিরক্তিকর" পত্রিকা দুটি, যা নতুন ও তরুণ কবি-লেখকদের লেখার অভ্যাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নীলাদ্রির প্রতিটি কাজই তাঁর জীবনবোধ ও সাহিত্যের প্রতি গভীর  দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে তোলে। 

উল্লেখ্য "ধুলো ঝাড়ছি LIVE" (আলোপৃথিবী), "এবং নাব্যতা" (আলোপৃথিবী), "বারুদ ও বাদামি বেড়াল" (বিরক্তিকর), "নীলাদ্রি দেবের কবিতা" (পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি), "করোটির ঘাসে আক্রেলিক" (বিজল্প), "জেব্রাক্রসিং ও দ্বিতীয় জন্মের কবিতা" (দি সী বুক এজেন্সি), "বেঁটে মানুষের ডায়েরি" (অক্ষরবিন্যাস)।

গদ্যপুস্তিকা- "যা যাবতীয়, অর্গানিক" (পারস্পরিক),

সম্পাদিত বই- "পূর্ণেন্দু শেখর গুহ : একটি অধ্যায়", (অক্ষরবিন্যাস)।

সহ সম্পাদিত "উত্তর জনপদের নির্বাচিত কবিতা", (শহরতলি)।



কবিতা


১।

নির্বাসিত অতিথি মাত্র
দিন দিন পিছোচ্ছি এক একটি ফলক
কাদা হয়ে শুয়ে আছি ড্রেনের ধারে
মরা মাছের ঝোলে হাত চোবাচ্ছি
টেকনোলজি গাধার পিঠে টগবগ
দশ নয় আট সাত ছয়
মৃত্যু পরোয়ানা চাই
ট্যাগ লাগাচ্ছি দেহে

                                                        * (ধুলো ঝাড়ছি LIVE, আলোপৃথিবী, ২০১৬, ২০২০)

 
 

২।

নদী ও শ্মশানের মাঝে কোনো সিঁড়ি নেই
ধাপে ধাপে নেমে গেলে
কখনোই উঠে আসা যায় না
 
শেষ ছাই ছুঁড়ে
নিয়মমাফিক উঠে আসে কেউ
ছাই থিতিয়ে যায় ক্রমশ
যেভাবে থিতিয়ে যায় বাকি সব
 
নদী ও শ্মশানের মাঝে সিঁড়ি খুঁজতে থাকি

                                                                * (এবং নাব্যতা, আলোপৃথিবী, ২০১৯)

 
 

৩।

নিশ্চিহ্ন অতীত থেকে তালপাতা তুলে রাখি
ক্রমে ধূসর হয় আয়ু
যা থেমে আসে, তার গতি বিষয়ক আলোচনা
আপাতত বন্ধ থাক
জ্যামিতি ও জনগণনা, বিপ্রতীপে
মাঝবরাবর সম্পর্কের সাঁকো
                                                        * (বারুদ ও বাদামি বেড়াল, বিরক্তিকর, ২০২২)
 
 

৪।

আদি মধ্য নড়ে বসে কখনও হঠাৎ
শামিয়ানা, আতসকাচ
সদ্যোজাতর অতিরাক্ষসগণ
অসুর যেভাবে আত্মীয়, উত্তরাধিকার
নির্বাচিত দেবতা সমগ্রের
সেই প্রত্নচোখ ধূসর হয়েছে
অজস্র জন্মের ভিড় কাদা হয়ে আছে
কখনও শ্বাস দীর্ঘ হচ্ছে, প্রশ্ন
মানুষের ছায়ায় বেঁটে হয়ে আসছে
অন্য টুকরো মানুষ শরীর
                                                * (নীলাদ্রি দেবের কবিতা, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ২০২৪)
 
 

৫।

দগ্ধ সময়ের গভীরে এলোমেলো ছাই
কুচিখানেক মেঘ ডুবে যাচ্ছে
যজ্ঞের চতুর্ভুজে দুধ দই জলের মিশ্রণ
শেষ আর্তনাদ রাখে বাহাতি শঙ্খের জল
তৃষ্ণা মুছে দেয়, স্নান উপশম
পোড়া কাঠ খুঁজি, এইসব দাগ
মাটির কপালে লাগে সংকেত সংগ্রহ
                                                    * (করোটির ঘাসে আক্রেলিক, বিজল্প, ২০২৪)
 
 

আপেল ও আমরা

আপেলগুলোকে ভালোবাসা ছুঁয়ে যায়
জমাট ভালোবাসা লেগে থাকে ওর গা'য়
 
আপেলে ছুরি বসালে
তাই হয়তো রক্ত ফিনকি দিয়ে ওঠে
আমরা কেউ কেউ দেখি
কেউ দেখি না
 
এই আপেলের ভেতরেই আমরা সবাই
আর বাইরে ছুরি হাতে আমাদের ঘাতক,
আমরা।
                                                  * (জেব্রাক্রসিং ও দ্বিতীয় জন্মের কবিতা, দি সী বুক এজেন্সি, ২০১৯)
 
 

ইকেবানা

প্রত্যেকের যে সাড়ে তিন হাত ইকেবানা
তাতে ফুল যতটা শুকনো থাকবে,
শ্যাওলা থেকে অস্পষ্ট নেমে আসবে জল
বায়বীয় মূল অর্বুদে জাপটে রাখবে গান
এসব প্রশ্ন উত্তর আপাতত থাক
বরং মাটি দিয়ে লেপে রাখি মাটি
সম্পর্ক, সম্পর্কের ওম দিয়ে
                                                            * (বেঁটে মানুষের ডায়েরি, অক্ষরবিন্যাস, ২০২৩)
 
 

তৃতীয় পরিসর

সময়ের ফাঁস কিংবা ফাঁস সময়ের
রজ্জু ক্রমে দড়ি, শেকল পর্যন্ত
মব মৃত্যু গ্রাফিতির একরৈখিক
গদি এককে ভাঙে, বহু কোণ ও রেখায়
এই স্বর প্রিজমের আলোর মতো
সমান্তরালে পেঁচা ডাকে, রিপিট বাজে
প্রতিটানে বশ্যতা, তবু মানুষ বন্ধন
আলোতে ভুল অবস্থানে ছায়া বাড়ে
মানুষ মানুষের অন্ধকার ভাঙে একক, যৌথ
এক রাতে গলে যায় সূক্ষ্ম, জন্মদাগ
পড়ে থাকে তর্পণের তিল, উঠোনে শিউলি
 
 

প্রচ্ছদ

ছায়ার ভেতর কেমন ছায়া পড়ে আছে
ফেলে আসা চিঠিপত্র আরও হলুদ হল
বাঁশি বাজিয়ে ফিরে যাচ্ছে যারা,
কেউ ভেঙে যাওয়া মুহূর্তকে
স্পর্শ দিতে পারবে না, বাতাসা,
এক গেলাস জল
হাঁটতে দৌড়তে কোথায় পালিয়ে যাচ্ছি
সময়ের হলুদ ঘিরে ধরছে ত্বক,
আয়ুর প্রচ্ছদ
 
 

শীর্ষক

গতির পাশে স্থির রাখছি নয়ানজুলি
শাপলা ফুটে আছে
দৈর্ঘ্য প্রস্থ না জেনে টুকরো করি ছবি
প্যানেল কাজের গর্ভে সম্ভাবনা মেশে
শেপ নেয় অভিন্ন
এক থেকে অন্যতর একের যাতায়াতে
চোখ পিটপিট করি, বোধ পায় দেখা
যা বাকি থাকে, অনন্ত, তাড়া করে

                                                                                    * (অপ্রকাশিত)



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ